পুঁজিবাজারের স্থবিরতায় গভীর হচ্ছে অর্থনীতির চাপ

আস্থা সংকট, বিদেশি পুঁজি প্রত্যাহার ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি; নীতিগত ব্যর্থতার অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী প্রবণতা, কম লেনদেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের চাপে রয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের প্রত্যাশিত অবদান এখন অনেকটাই সীমিত। এর প্রভাব পড়ছে ব্যাংকিং খাত, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতায়।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নীতিগত দুর্বলতা, ধারাবাহিক ভুল সিদ্ধান্ত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতার ঘাটতিকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে কার্যকর করা না গেলে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ আরও বাড়তে পারে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “পুঁজিবাজারের অকার্যকারিতার অর্থনৈতিক মূল্য স্পষ্ট। ব্যাংকগুলো এখন তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি স্বল্পমেয়াদি আমানত পাচ্ছে। কিন্তু কার্যকর পুঁজিবাজার না থাকায় সেই তহবিল দিয়েই দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে হচ্ছে।”

তার মতে, এ ধরনের অর্থায়ন কাঠামো ব্যাংকের তারল্য ও সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনায় বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। সাধারণভাবে ব্যাংক স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়নে বেশি কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও অবকাঠামো বিনিয়োগে পুঁজিবাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাজার দুর্বল থাকায় সেই চাপও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর গিয়ে পড়ছে।

ব্যাংকনির্ভর শিল্পায়নে বাড়ছে ঝুঁকি

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের শিল্পায়নের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক ঋণনির্ভর। কার্যকর পুঁজিবাজার থাকলে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শেয়ার ও বন্ডবাজার থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হতো। কিন্তু পুঁজিবাজারের দুর্বলতায় সেই বিকল্প পথটি কার্যত সীমিত হয়ে গেছে।

এর প্রভাব খেলাপি ঋণের প্রবণতাতেও পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ২০০৮ সাল পর্যন্ত খেলাপি ঋণ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।

‘নীতি নির্ধারকদের দূরদর্শিতার ঘাটতি রয়েছে’

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক সিদ্দিকী বলেন, “পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা না থাকায় বাজার কার্যত তলানিতে নেমে গেছে। নতুন বিনিয়োগও আসছে না।”

তিনি আরও বলেন, একসময় আইপিওর মাধ্যমে নিয়মিতভাবে বাজারে নতুন অর্থপ্রবাহ তৈরি হতো। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে নতুন আইপিও অনুমোদনের গতি কমে যাওয়ায় বাজারে নতুন পুঁজি প্রবেশের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।

ফারুক সিদ্দিকীর ভাষায়, নীতিনির্ধারণে “অজ্ঞতা, অন্ধত্ব ও অদূরদর্শিতা” বাজারের বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করেছে।

বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রবণতা

পুঁজিবাজারের দুর্বলতার আরেকটি বড় সূচক হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণকে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে শেয়ারবাজার থেকে নিট ৬৬ মিলিয়ন ডলার প্রত্যাহার হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই প্রত্যাহারের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ মিলিয়ন ডলার।

এর আগে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছর মিলিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার প্রত্যাহার হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তাকে বিদেশি বিনিয়োগ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকিং খাতের চলমান সংকট বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তার মতে, “মাত্র চার-পাঁচটি ব্যাংক ভালো অবস্থায় থাকলেও বাকিগুলোর পরিস্থিতি নড়বড়ে।” এর সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ এবং কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়াও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

সাইফুল ইসলাম বলেন, নতুন ও ভালো কোম্পানির ঘাটতিও বিদেশি বিনিয়োগ কমার একটি কারণ। “কিছু তালিকাভুক্ত কোম্পানি মোটামুটি ভালো করলেও অনেক কোম্পানির লভ্যাংশ দেওয়ার রেকর্ড ভালো নয়”—বলেন তিনি।

ফ্লোর প্রাইস ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক

পুঁজিবাজারের বর্তমান দুরবস্থার পেছনে অতীতের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের একাংশ ২০২০ ও ২০২২ সালে ফ্লোর প্রাইস আরোপের সিদ্ধান্তকে বাজারের স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার ও তারল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন।

তাদের দাবি, কৃত্রিমভাবে মূল্যস্তর ধরে রাখার ফলে বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন ব্যাহত হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ক্ষতির মুখে পড়ে। পরে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি।

সমালোচকদের একটি অংশ বর্তমান নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, বাজারে কাঠামোগত সংস্কার, নতুন ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির পরিবর্তে নিয়ন্ত্রক কার্যক্রমের বড় অংশ জরিমানা, তদন্ত ও মামলা-কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজার পরিস্থিতির পেছনে শুধু নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত নয়, তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, করপোরেট গভর্ন্যান্স, সামষ্টিক অর্থনীতি এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণ—সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে।

জরিমানা, কারসাজি ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির করপোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বল। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ঘাটতি, সময়মতো তথ্য প্রকাশ না করা এবং কিছু ক্ষেত্রে বাজার কারসাজির অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বাজারে সিন্ডিকেট ও কারসাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সমালোচকদের মতে, এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত ও দৃশ্যমান প্রতিকার না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো কঠিন।

তাদের অভিযোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে কঠোরতার কথা বলা হলেও বাজারে তার দৃশ্যমান ইতিবাচক প্রতিফলন সীমিত। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের মধ্যে নিয়ন্ত্রক কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি চাপে সাধারণ বিনিয়োগকারী

পুঁজিবাজারের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বাজারে মূলধন হারানোর পাশাপাশি অনেকে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ আটকে থাকার সমস্যায় রয়েছেন। এর সঙ্গে লভ্যাংশের অনিশ্চয়তা এবং বাজারে ভালো বিনিয়োগের সুযোগের ঘাটতিও যুক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব শুধু বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সঞ্চয় কমে যাওয়া, ভোগব্যয় সংকুচিত হওয়া এবং বিনিয়োগ সক্ষমতা হ্রাসের মাধ্যমে এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

পুঁজিবাজার পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন আস্থা ও সংস্কার

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করতে হলে শুধু সূচক বাড়ানো বা বাজারে সাময়িক তারল্য দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার করা, কার্যকর নজরদারি, দ্রুত ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ, কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগবান্ধব নীতি।

একই সঙ্গে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বিকল্প তৈরি এবং বন্ড ও ইকুইটি মার্কেটের পরিসর বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, একই ধরনের ভুল নীতি, দীর্ঘস্থায়ী নিষ্ক্রিয়তা এবং আস্থার সংকট চলতে থাকলে পুঁজিবাজারের সমস্যা কেবল শেয়ারবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে ব্যাংকিং খাত, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।